রোবোট সোফিয়াকে নিয়ে তো অনেক লাফালাফি হল, এবার থামা উচিত আমাদের । অনেকটা থেমেও গেছি আমরা। যখন দেখেছি আমাদের দেশের ছেলেরাও পারে রোবোট বানাতে, কেবল দরকার পৃষ্ঠপোষকতা। তো চলুন, আজ একটু রোবোটিজম নিয়ে নাড়াচাড়া করা যাক।

বিশ্ব আধুনিক রোবোটিক যুগে প্রবেশ করে ১৯৫০সনে, যখন এলান টিউরিং নামক একজন বিজ্ঞানী আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স সম্পর্কে ধারণা দেন। তিনি একটি পরীক্ষণ আবিস্কার করেন যাকে টিউরিং টেস্ট বলা হয়। এই পরীক্ষণের মাধ্যমে কোন একটি যন্ত্র নিজে নিজেই পরিবেশ থেকে শিক্ষা নিয়ে কাজ করতে পারে কি না অর্থাত বুদ্ধিসম্পন্ন কি না তা পরীক্ষা করা হয়। তবে সে সময় অল্প কিছুদিন এ বিষয়ে গবেষণা করার পর এই গবেষণাকর্ম স্তিমিত হয়ে পড়ে, এর প্রধান কারণ হিসেবে বলা হয়,সে সময় কম্পিউটার গুলো ততটা শক্তিমত্তা সম্পন্ন ছিল না। পরবর্তীতে বেশ কয়েক বছর পর যখন থেকে কম্পিউটার গুলোতে মাইক্রোচিপ ও মাইক্রো প্রসেসর ব্যবহার শুরু হয় এবং পাওয়ার ফুল প্রসেসিং সিস্টেম সংযুক্ত হয় তখন থেকে পূণরায় এই গবেষণা নতুন করে চালু হয় যা বর্তমান রূপে এসে পৌৗছেছে।

শুরুতেই জেনে নেয়া যাক রোবোট কী?: রোবোট হচ্ছে এমন একটি যন্ত্র যা স্বয়ংক্রিয় ভাবে কাজ করতে পারে।অন্যভাবে বলতে গেলে বলা যায় রোবোট হচ্ছে মানুষের কাজে সহযোগিতা করতে পারা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র। (আমাকে ফেসবুকে  দেখুন)

রোবোট দেখতে কী মানুষের মতোই হওয়া জরুরি?: না। এক কথায় বলতে গেলে এটি মানবাকৃতিরই হতে হবে এমন কোন কথা নেই। যে কোন আকৃতির হতে পারে। মানুষ, কুত্তা, বিলাই, ইন্দুর, হনুমান, তেইল্লাচোরা (আরশোলা), বান্দর কিংবা হতে পারে শুধু হাত, পা বা মাথা আকৃতির, যেমন বিভিন্ন গাড়ি কোম্পানিতে কিছু স্বয়ংক্রিয় রোবোট দ্বারা কাজ করা হয় যেগুলো গাড়ির যন্ত্রপাতি জুড়ে দেয়, সেগুলো কেবলই হাত আকৃতির।

রোবোটের ইতিহাস : এবার একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক, রোবোট এল কোত্থেকে? মূলত যদি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রকেই আমরা রোবোটের সংজ্ঞা ধরে নিই, তাহলে বলা যায় প্রাচীন কালেও রোবোটের অস্তিত্ব ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় আর্কাইসের কৃত্রিম ঘুঘু কিংবা আলেকজান্দ্রিয়ার স্বয়ংক্রিয় ভাবে কথা বলতে পারা যন্ত্র হিরোর কথা। এর পরবর্তীতে মুসলিম জ্যোতির্বিদ ও বিজ্ঞানীগণ বহু স্বয়ংক্রিয় জ্যোতির্বিদ্যার যন্ত্র ও সামরিক যন্ত্র তৈরি করেছিলেন, কিন্তু ইসলাম ধর্মমতে মূর্তি নির্মাণ ও প্রাণী সদৃশ কোন কিছু নির্মাণ নিষিদ্ধ হওয়ায় তাদের তৈরি যন্ত্রগুলো মানুষ বা প্রাণীর আকৃতিতে তৈরি হতো না। এর পরবর্তীতে ১৭৩৮ সনে দে ভকানসন তার তৈরি একটি বংশীবাদক, একটি পাইপ ও স্বয়ংক্রিয় ভাবে ডানা ঝাপটাতে পারা ও দর্শকের হাত থেকে খাবার গ্রহণ করতে পারা একটি হাঁস প্রদর্শণ করেন।

রোবোটিক্স এর উন্নয়ন ধীর গতিতে হলেও ধারাবাহিক ভাবেই চলমান ছিল, কেননা, প্রাচীন কাল থেকেই কৌতূহলী মানুষ নিজেদের মতো করে যান্ত্রিক মানুষ তৈরির চেষ্টা করেই যাচ্ছিল। প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে  তাই রোবোটিক্সেরও উন্নয়ন চলছিল সমান তালে এবং তা পূর্ণতা পেতে শুরু করেছে এলান টিউরিং এর আটিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সের আবিস্কারের পর থেকে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স কী?: এবার আসা যাক ফিচারটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স হচ্ছে একটি রোবোট তৈরির মূল প্রোগ্রাম।  এটি হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। মানুষ যেমন পরিবেশ পরিস্থিতি বিচার করে কাজ করতে পারে তার বুদ্ধি দিয়ে এবং এটিকে বলা হয় মানুষের প্রাকৃতিক বুদ্ধিমত্তা, তেমনি কোন মেশিন যখন এই কাজটি করতে সক্ষম হয় তখন এটিকে বলা হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। যেমন আমরা গুগলের কথা বলতে পারি। যখন গুগলে আমরা কোনকিছু সার্চ করি তখন এটি পূর্বে সার্চহিস্টোরি, কান্ট্রি ইত্যাদি বিচার করে একটি রেজাল্ট দেখায়। কিংবা আমরা কর্টানার কথাও বলতে পারি, উইন্ডোজ ১০ অপারেটিং সিস্টেমে যে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেয় ও মৌখিক নির্দেশে কাজ করতে পারে অনায়াসে।
এবার আসা যাক রোবোট তৈরি করতে এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স কীভাবে কাজে লাগানো হল সে কথায়। রোবোট তৈরিতে কাজ করে ডেটা সায়েন্স। ডেটা সায়েন্স হচ্ছে আসলে পরিসংখ্যান, মেশিন লার্নিং ও ডেটা ভিজুয়ালাইজেশনের সমস্টি। এটির কাজ হচ্ছে বিভিন্ন ডাটা বিশ্লেষণ করে কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং উভয়টিই আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সের শাখা।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সকে তাই এভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় যে, এটি এমন একটি প্রোগ্রাম যা দ্বারা কোন মেশিন আশপাশের পরিবেশ ও হিস্টোরিক্যাল ডাটা বিশ্লেষণ করে নিজে নিজেই স্বয়ংক্রিয় ভাবে কার্যসম্পাদন করতে পারে।

আমরা চাইলে যে কোন মেশিনে হয়ত এমন প্রোগ্রাম সেট করে দিতে পারব যে প্রোগ্রাম দিয়ে মেশিনটি হাটতে পারবে, কথা বলতে পারবে কিংবা নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারবে। কিন্তু যদি এমন প্রোগ্রাম করে দেয়া হয় যে, মেশিনটি নিজে নিজেই হাটতে শিখে নেয় এবং সুনির্দিষ্ট বা অনির্দিষ্ট যে কোন প্রশ্নেরই উত্তর খুজেঁ নিয়ে বলে দিতে পারে তবে সেটাই হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

(তথ্যপ্রযুক্তির উন্মুক্ত প্লাটফরমে প্রবেশ করতে যোগ দিন আমাদের ফেসবুক পেজ “শখের স্কুল”এ)

আমাদের দেশের রোবোট রিবো , বন্ধু কিংবা হংকংএর রোবোট সোফিয়া, সবার মধ্যেই ব্যবহার করা হয়েছে এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স। প্রতিটি রোবোটে ব্যবহার করা হয় একটি মাদারবোর্ড, প্রসেসর এবং মেমোরি। এরপর বিভিন্ন প্রোগ্রামের মাধ্যমে রোবোটটির স্বাভাবিক ও নির্দিষ্ট কিছু কাজ যেমন ঠোঁট নাড়ানো, আলো জ্বালা ইত্যাদি সেট করে দেয়া হয়। এরপর এড করা হয় আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স এর বিভিন্ন প্রোগ্রাম যা দ্বারা এবার রোবোটটি প্রশ্ন থেকে উত্তর খুঁজে নেয় এবং দেয়। যেমন, আমাদের দেশের রোবোট রিবোকে যখন বলা হয় হাত উঠাও, সে হাত উঠায়। রোবোট বন্ধুকে যখন কোন প্রশ্ন করা হয়, এবং সেই প্রশ্নটি যখন তার প্রোগ্রামে না থাকে তখন সে গুগলে খুঁজে বের করে উত্তর দেয় কিংবা রোবোট সোফিয়াকে যখন কোন প্রশ্ন করা হয় তখন সে বিভিন্ন অভিব্যাক্তি প্রকাশ করে। এসবই হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সের ফলাফল।

সব প্রোগ্রাম ঠিক ঠাক হলে রোবোটকে একটা আকৃতি প্রদান করে প্রদর্শণযোগ্য করে তোলা হয়। এই হচ্ছে রোবোটের আসল রহস্য। সুতরাং রোবোট সোফিয়াকে নিয়ে যতটা লাফালাফি করা হয়েছে এতটা  না করলেও চলত। মানব জাতি একটা পুতুল বানিয়েছে, কোন এলিয়েন বানায়নি।

রোবোটের ব্যবহার: আজকাল প্রায় সর্বক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হচ্ছে রোবোট। বিভিন্ন প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গুলোর সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম আইসি তৈরি কিংবা ডায়াগ্রাম ড্রইং এ, গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গুলোতে,হোটেল-রেস্তোরার ওয়েটারের কাজে, চিকিৎসা ক্ষেত্রে এমনকি সামরিক ক্ষেত্রেও।

রোবোটের ভাল-মন্দ: আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সের উন্নতির ফলে দুনিয়া অনেক সহজ হয়ে যাচ্ছে, মানুষের পরিশ্রম কমে যাচ্ছে এবং বিনোদন, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি আরো অনেক নিঁখুত হচ্ছে। কিন্তু এর বেশ কিছু অকল্যাণকর দিকও রয়েছে অন্যান্য প্র্রযুক্তির মতোই। যেমন এর ফলে মানুষের কর্মসংস্থানের অভাব হবার আশংকা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অতিরিক্ত উন্নয়নের ফলে মানব জাতির ধ্বংস্বের আশংকা ইত্যাদি। এগুলো তো কেবল আশংকা, যা সংঘটিত হয়ে গেছে তার পরিমাণও নেহায়েত ফেলনা নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে উড়ন্ত চিল এর আকৃতির ভয়ানক সব বোমা বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। নিকট অতীতে আশির দশকে শুরু হয়ে নব্বইয়ের দশকে শেষ হওয়া আফগান-রাশিয়ার ‍যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি হাঁস ও পুতুল আকৃতির বোমাগুলো শত শত শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।

প্রযুক্তির যেমন কল্যাণ আছে তেমনি আছে অকল্যাণও। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত ও যথাযথ না হলে, এই প্রযুক্তির কল্যাণে মানব জাতির উন্নতি হবে বটে কিন্তু সেই উন্নতি তার সাথে সাথে ধ্বংস্বকেও টেনে আনবে। 

আজ এপর্যন্তই, সবাই ভাল থাকবেন,আল্লাহ হাফেজ।

এরকম আরও তথ্য পেতে  “শখের স্কুলের” সাথেই থাকুন।

লাইক দিন “শখের স্কুলের”  ফেসবুক পেজে

জয়েন করুন“শখের স্কুলের”  ফেসবুক গ্রুপে

সাবস্ক্রাইব করুন “শখের স্কুলের”  ইউটিউব চ্যানেল

টিউনারকে ফলো করুন>> 

অসংখ্য ধন্যবাদ।আল্লাহ হাফিজ

জ্ঞান ভাগাভাগিতে কোনো কার্পণ্য নয়! বাংলা ভাষার কনটেন্ট সমৃদ্ধ করার এই উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে শেয়ার করুন। 

Similar Posts:

    None Found

Facebook Comments

সাধারণ জীবন যাপন পছন্দ, তবে স্ট্রাগল এলে জড়িয়ে নিই। প্রশ্ন করতে এবং উত্তর পেতে ভালবাসি, ভালবাসি প্রশ্ন পেতেও। শিখি, অন্যকে বিতরণ করে আনন্দ পাই। অহেতুক তর্ক ভাললাগে না, জানার জন্য নিজের বিশ্বাসের উল্টো প্রশ্ন করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.