‘কবি ইকবাল’ একটা বই লিখেছিলেন। বইটার নাম ছিল ‘শেকোয়া’। বইটিতে আল্লাহর অস্তিত্ত্ব সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করেছিলেন তিনি। যেমনঃ আল্লাহ কে? আল্লাহর পরিচয় কি? আল্লাহকে আমরা দেখি না কেনো? ইত্যাদি।

তখনকার আলেম সমাজ ক্ষেপে গিয়ে কবি ইকবালকে ‘কাফির ইকবাল’ নামে ভূষিত করে। এরপর ‘কবি ইকবাল’ আরেকটা বই লেখেন। বইটার নাম ‘জওয়াবে শেকোয়া’। এই বইতে তিনি ‘শেকোয়া’-তে যেসব প্রশ্ন করেছিলেন তার প্রতিটি প্রশ্নেরই উত্তর দেন এবং তা কুরআন ও প্রসিদ্ধ হাদীস থেকে। এবার আলেম সমাজ উল্লসিত। তারা তখন ‘কাফির ইকবাল’এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘আল্লামা ইকবাল’। আমরাও একইরকম। কোনো কিছু বিচার না করেই সিদ্ধান্ত নিই। কবি ইকবাল’ই করে দেখিয়ে দিলেন যে আমরা কোনোকিছু স্বেচ্ছায় বিচার করতে পারি না। তাই ধর্মীয় ব্যাপারগুলোর ক্ষেত্রে আগে যাচাই করবেন। তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন। ধর্মের কথা উল্লেখ আছে বলেই যে সত্য হয়ে গেল তা মনে করবেন না। আগে কুরআন ও হাদীসে সে সম্পর্কে জানবেন তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন ।

মোবাইলে SMS আদান-প্রদান যখন শিখলাম তার কিছুকাল পর যখন SMS খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করল, তখন নিচের মতো SMS আমরা প্রায় সবাই পেয়েছি।

‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ (সাঃ), এই কালিমা ২০ জনকে পাঠান (আমি বাদে)। ইনশাল্লাহ ২০ দিনের মধ্যে ভালো কোনো সংবাদ পাবেন। আর যদি অবিশ্বাস করেন তাহলে ২০ দিনের মধ্যে খারাপ কোনো সংবাদ পাবেন।

লাইনটা মুটামুটি এই। তবে কালিমার স্থলে মহান আল্লাহর গুণবাচক নাম, কোনো পরিচিত দুআ, বর্ণমালায় আরবী শব্দ ব্যবহারের প্রচলন (যেমনঃ A for Allah, B for Banda, C for Caalima, D for Dua etc.) ইত্যাদিও ব্যবহার করে SMS পাঠাতেও দেখেছি।

তবে মাঝে ব্যাপারটা অনেকক্ষেত্রে সমালোচিত হবার পর দেখেছি অনেকে ‘আর যদি অবিশ্বাস করেন………’ লাইনটা তুলে দিয়ে SMS পাঠাচ্ছেন।

এখন ফেসবুকেও দেখছি এরকম SMS পাঠানো হয়। এতে দেখি অনেকে বিরক্তও বোধ করেন আবার অনেকে অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও পাঠাতে বাধ্য হন। কারণ, ক্ষতির কথাও উল্লেখ থাকে। কিছু বললে বলেন যে, একজন বন্ধু পাঠালো তাই শেয়ার করলাম।

আবার, স্কুলে পড়াকালীন সময়ে একটা লিখিত কাগজ খুব পেতাম। বিষয়টা মুটামুটি এরকম,

জনৈক এক বাবা অমুক মাজারে একদিন শয়ন করিতেছিলেন। তিনি স্বপ্নে দেখলেন যে, মহানবী (সাঃ) তাকে বলছেন যে, কলিযুগে পাপ অনেক বেড়ে গেছে। তাদেরকে সঠিক পথে ফিরানোর জন্য যেন তিনি চেষ্টা করেন। আর যে এই খবরটা পড়বে সে যেন ২৫ জন লোককে এই কাগজটা পৌছে দেয়।

মহানবী (সাঃ)-কে স্বপ্নে দেখা সত্যিই সৌভাগ্যের ব্যাপার। আর মানুষকে সৎপথে ফিরানোর জন্য পবিত্র কুরআনে অনেক আগে থেকেই বলা আছে। এরপর।

সেখানে আরো বলা হয়ে থাকে যে, চট্টগ্রামের অমুক লোক কাগজটি ২৫ জনকে বিতরণ করে আর ৭ দিন পর সে মাটি খুঁড়ে একটা সোনার হাঁড়ি পায়। পরে সে আরো ১০০০ কপি বিলায়। আবার কোনো একজন বেকার কাগজটির ৫০ কপি করে লোকজনকে দেয়। কিছুদিনের মধ্যেই তার চাকুরি হয়ে যায়।

আবার বলা হয়, একজন লোক অবিশ্বাস করে কাগজটি ছিঁড়ে ফেলে, পরদিন তার স্ত্রী মারা যায়। এরকম আরো অনেক ক্ষতি হয়। তাই অনেকেই লাভ হোক না হোক, ক্ষতি যাতে না হয় সেজন্য সেটা কপি করে বিতরণ করত।

আমরা আসলে একটা ধর্মীয় ব্যাপার আমাদের কাছে আসলে সেটা যাচাই না করেই বিশ্বাস করে নিই। যার ফলে ধর্মের দোহাই দিয়ে অনেক কাজ করা মানুষের সহজ হয়। আপনি হয়তো পাঠাতে চাচ্ছেন না কিন্তু ঐ যে ধর্মের দোহাই, তার উপর না পাঠালেও ক্ষতির কথা লেখা আছে। তাই আপনি পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন।
ভাগ্য গণনায় বিশ্বাস স্থাপন করা স্পষ্টত কুফরি। SMS আর চিঠি অন্যকে ছড়িয়ে দেয়ার ফলে ভাগ্যের উন্নতি হবে না দিলে খারাপ হবে এরকম নিশ্চিত জ্ঞান সেই ব্যক্তিকে কে দিয়েছে?

আসুন দেখি এ ব্যাপারে ইসলাম কী বলে-

৪০৯১। যুহায়র ইবনু হারব ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা আমাদেরকে মানত কর্য থেকে নিষেধ করতে থাকেন এবং বলেনঃ যে, তা (তাকদীরের) কিছুই ফিরিয়ে দেয় না। তবে এর মাধ্যমে কৃপনদের হাত থেকে কিছু বের করা হয়।

বল, ‘আমি আমার নিজের কোন উপকার ও ক্ষতির ক্ষমতা রাখি না, তবে আল্লাহ যা চান। আর আমি যদি গায়েব জানতাম তাহলে অধিক কল্যাণ লাভ করতাম এবং আমাকে কোন ক্ষতি স্পর্শ করত না। আমিতো একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা এমন কওমের জন্য, যারা বিশ্বাস করে’। (সূরা আরাফঃ ১৮৮)

SMS এবং চিঠিগুলোতে নতুন পদ্ধতীর ইবাদতের কথা লেখা থাকে যার ফলে কল্যাণ লাভ কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে জান্নাত লাভের কথা পর্যন্ত লেখা থাকে। বেশির ভাগ সময় কথা গুলো মিথ্যা লেখা থাকে।  কেউ যদি এইগুলোতে বিশ্বাস করে তাহলে তার মানে হবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট ঠিক মত দাওয়াত পৌছাননি! (নাউযুবিল্লাহ, আল্লাহ তা’আলার নিকট এরকম গোমরাহী আর মূর্খতা থেকে আশ্রয় চাইছি)

“যে ব্যক্তি আমার উপর ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যারোপ করবে সে তার স্থান জাহান্নামে বানিয়ে নিল”।  সূত্র: Knowledge, Bukhari :: Book 1 :: Volume 3 :: Hadith 106 – 110

আর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে এরকম অপ্রয়োজনীয়, অহেতুক যা কোনো উপকারে আসেনা, শুধুমাত্র ধারণার বশবর্তী হয়ে, কোনো কিছু যাচাই না করে, ধর্মীয় বিষয়কে বিশ্লেষণ না করে ঝোঁক বা আবেগের বশে এধরনের লাইন শেয়ার করা তথা মূল্যবান জিনিসগুলোকে মূল্যহীন করার অভ্যাস না করাই মনে হয় শ্রেয়। তার বদলে পবিত্র কালিমাটা পবিত্র হয়ে নিজ মুখে ঐ সংখ্যকবার পাঠ করুন। অনেক সাওয়াব পাবেন।

Similar Posts:

    None Found

Facebook Comments

খুবই সাধারণ সাধাসিধে একজন মানুষ। টেকনোলজি ভালবাসি , ভালবাসি নতুন কিছু শিখতে। আর বিশ্বাস করি শেখানটাই শেখার সবথেকে ভালো মাধ্যম।

Leave a Reply

Your email address will not be published.