মায়ান ক্যালেন্ডার সম্পর্কে কমবেশী ধারনা সবাইপেয়ে থাকলেও এই ক্যালেন্ডারেরআবিষ্কারক জাতি বা মায়া জাতি সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। মায়া সভ্যতার মানুষগুলো কেমন ছিলো? কেমন ছিলো তাদের বসতি বিন্যাস??

চলুন দেখি………

মেসোআমেরিকায় গড়ে ওঠা পাচটি সভ্যতার অন্যতম এই মায়া সভ্যতা। বাকি চারটি ছিলো: ওলমেকান, তেউতোহুয়াকান, তোলতেক এবং আজটেক। মায়া সভ্যতার সুনির্দিষ্ট অবস্থান ছিলো সেন্ট্রাল আমেরিকা ও উত্তর আমেরিকার দক্ষিন অংশে। বর্তমান গুয়তেমালা ও মেক্সিকোতে ১৫০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে এই সভ্যতা গড়ে ওঠে। মূলত তাদের গুরুত্বপূর্ণ বড় শহর ”মায়াপান”- এর নামানুসারে এই সভ্যতার নাম মায়া সভ্যতা রাখা হয়। মায়া সভ্যতার সময়কালকে তিনভাগে ভাগ করতে পারি আমরা। প্রথমভাগে ২০০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ থেকে ২৫০ খ্রীস্টাব্দ সময়কালকে রাখা হয়, দ্বিতীয়ভাগে ২৫০-৯০০ খ্রীস্টাব্দ ও তৃতীয় ভাগে ৯০০-১৫০০ খ্রীস্টাব্দ সময়কালকে ধরে এই বিভাজনের সমাপ্তি করতে পারি। মায়ারা তাদের সর্বোচ্চ অর্জন করেছিল এই সময় বিভাজনের দ্বিতীয় ভাগেই। এই সময়ে তারা তাদের বিস্তৃতি ‘ইউকাতান পেনিনসুলা’ পর্যন্ত ঘটিয়েছিল। তাদের প্রায় ৪০ টির মতো শহর ছিলো যেগুলোর প্রত্যেকটিতে প্রায় ৫০০০ থেকে ৫০,০০০ মানুষ বসবাস করত।

Image result for মায়ান সভ্যতা

মায় সভ্যতার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ অর্জন ছিলো নিচের কয়েকটি বিষয়: 

১. সমাজ ব্যবস্থা
২. দুধর্ষ যোদ্ধা
৩. ব্যবসায়ী
৪. জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শিতা
৫. দক্ষ স্থপতি
৬. ওষুধ সম্পর্কে উচ্চ জ্ঞান
৭. খেলাধুলা

 

মায়া সভ্যতা, গুয়াতেমালার গ্রীষ্মপ্রধান নীচু অঞ্চলের কেন্দ্র অবস্থিত এই মায়ান সাম্রাজ্য বা মায়া সভ্যতা খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকের (অ্যান্নো ডমিনি এর ৬ষ্ঠ শতক) কাছাকাছি সময়ে শক্তি, শৌর্য এবং প্রভাবে সফলতার শীর্ষে উঠে। মায়ানরা কৃষি, মৃৎশিল্প, হায়ারোগ্লিফিক লিখন, ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা তৈরি, গণিতশাস্ত্র ইত্যাদিতে ব্যাপক উন্নতি সাধিত করে এবং আধুনিক পৃথিবীর জন্য নানা রকম চিত্তাকর্ষক এবং দৃষ্টিনন্দন বিভিন্ন স্থাপত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক শিল্পকর্ম রেখে গেছেন। মায়ায় খননকাজে আবিষ্কৃত হয় বিভিন্ন প্লাজা, মন্দির, প্রাসাদ, পিরামিড, এমনকি একটি কোর্ট যেখানে বল দিয়ে খেলতে হয় এমন খেলা গুলো হতো। আর এই কোর্টটি মায়া সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। তবে মায়া সভ্যতার সবচেয়ে বড় বড় পাথুরে নগরীগুলো ৯০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছিল। তবে মায়া সাম্রাজ্যের নাটকীয় পতনের কারন সম্পর্কে আজও পন্ডিতরা দ্বিধান্বিত এবং বিতর্কিত।

ক্লাসিক মায়া সভ্যতা: পাথুরে শহরের উৎপত্তি

Image result for মায়ান সভ্যতা

মায়ারা ছিলো খুবই ধার্মিক প্রকৃতির। তারা প্রকৃতির বিভিন্ন জিনিসকেই পূজা করতো যার মধ্যে ছিলো সূর্য, চাঁদ, বৃষ্টি, শষ্য ইত্যাদি। মায়া সাম্রাজ্যের শীর্ষস্থানে ছিলেন রাজা বা “কুহুল আযা” নামে কোন পবিত্র প্রভু, যিনি দেবতাদের সাথে সম্পর্কযুক্ত ছিলেন এবং এই “কুহুল আযা” বা রাজা নির্বাচন ছিলো পারিবারিক ভাবেই। তারা দেবতা এবং পৃথিবীর মানুষদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিবেচিত হয়েছিলো। আরা তারাই মায়া সভ্যতার বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও রীতিনীতি গুলো যথাযথ ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালন করতো।

ক্লাসিক মায়া সভ্যতা কালেই বেশিরভাগ মন্দির ও রাজপ্রসাদ নির্মিত হয় যা দেখতে অনেকটা পিরামিডের মত এবং কারুশিল্প ও শিলালিপি দ্বারা সুসজ্জিত। আর এই দৃষ্টিনন্দন স্ট্রাকচার এর কারনেই মায়ারা মেসোআমেরিকার অন্যতম গ্রেট আর্টিস্ট হিসেবে সুনাম অর্জন করেছে। ধর্মীয় অনুশাসন দ্বারা পরিচালিত মায়ারা গনিত এবং জ্যোতির্বিদ্যায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলো। বিশেষ করে শূন্যের ব্যবহার এবং ৩৬৫ দিনের উপর ভিত্তি করে একটি জটিল ক্যালেন্ডার পদ্ধতির উন্নয়ন। প্রাথমিক পর্যায়ে গবেষকরা মায়াদের একটি লেখক এবং পুরোহিতদের শান্তিপূর্ন সমাজব্যবস্থা মনে করলেও পরবর্তীতে তাদের বিভিনরন কাজকর্ম, শিলালিপি ইত্যাদি পরীক্ষা করে জানা যায় প্রতিদ্বন্দ্বী মায়াদের যুদ্ধ, নিপীড়ন এবং ধর্মের জন্য মানুষ আত্মত্যাগ সম্পর্কে।

মায়া সভ্যতার রহস্যময় অধঃপতন

খ্রিস্টপূর্ব আট শতকের শেষ দিক থেকে নবম শতকের মাঝামাঝি সময়ে মায়া সভ্যতায় এমন এক অজানা কিছু ঘটেছে যা এই সভ্যতার ভত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ৯০০ খ্রিস্টাব্দের আগেই এক এক করে দক্ষিনের নিম্নভূমিতে অবস্থিত ক্লাসিক শহরগুলি পরিত্যক্ত হয়, ফলে ঐ অঞ্চলে মায়া সভ্যতার মৃত্যু হয়। আর এই রহস্যজনক পতনের কারন এখনো অজানা যদিও অনেক পন্ডিতই নিজেদের মত করে বিভিন্ন তত্ত্ব দিয়েছেন।

তবে এর মধ্যে তিনটি তত্ত্ব গ্রহণযোগ্য বলে ধরে নেওয়া যায়। কেউ বিশ্বাস করতো যে, মায়ার জনসংখ্যা খুব বেশি হয়ে গিয়েছিলো। আর যা মায়ার পরিবেশ সহ্য করতে পারেনি। আবার অনেক পন্ডিত মনে করেন, প্রতিনিয়ত পরস্পরের সাথে যুদ্ধের ফলেই মায়া ধংস হয়েছে। আর আরেকটি তত্তব হলো পরিবেশের বিপর্যয়। হয়তো মায়া সভ্যতায় এমন কোন খরা, বন্যা বা অতিকায় শক্তিশালী প্রাকৃতিক কিছু আঘাত হেনেছিলো যার ফলে প্রাচীন এই মায়া সভ্যতা ধংস হয়।

তবে হয়তোবা মায়া ধংসের কারন এই তিনটির মিলিত কারনই: মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা, নিজেদের সাথেই যুদ্ধ আর কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়। আর স্প্যানিশ আক্রমনকারীরা মাা সভ্যাতায় আসার আগেই মায়া সভ্যতা চাপা পড়ে যায় সবুজ বনাঞ্চলের নিচে।

Image result for mayan calendar

ভবিষ্যৎবাণী

মায়া ধর্মের অন্যতম অঙ্গ ছিল এই দিনপঞ্জী তৈরি করা এবং যত্ন করে রাখা। তাদের দিনপঞ্জী ছিল অবিশ্বাস্য রকমের নিখুঁত। তারা এমন কিছু দিনপঞ্জী তৈরি করেছিল যা ৫৪ কোটি বছরের অসাধারণ ত্রুটিহীন হিসাব রাখতে সক্ষম হয়েছে। তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত ভবিষ্যৎবাণীর কথা তোমরা নিশ্চয়ই জান। হ্যাঁ ২০১২ এর ২১শে ডিসেম্বরে পৃথিবী ধ্বংস হবার কথা বলা হচ্ছে। বাস্তবে এটা মায়া ভাষা পড়তে না পারার মাসুল। তারা আদপেই পৃথিবী ধ্বংসের কথা বলে নি। তারা বলেছিল যে, এর পর পৃথিবীতে নতুন যুগ শুরু হবে। সেটাকেই ধরে নেওয়া হয়েছিল দুনিয়া ধ্বংসের ভবিষ্যৎবাণী! তারা প্রত্যেক পৃথিবী হতে দ্রষ্টব্য তারার আবর্তন, আগত দিনক্ষণ এর হিসাব অতি নিখুঁত ভাবেই করেছিল। তারা মনে করত যে, বছরের বেশ কিছু দিন তাদের কাছে পয়া এবং বছরের পাঁচ দিন অপয়া (এই পাঁচদিন + বাকি ৩৬০ দিন = ৩৬৫ দিন)। যে পাঁচদিন অপয়া ছিল সেদিন কোনও শুভকাজ তারা করত না, উপবাসে থাকত, কাজে বেরত না। কেবল বিছানায় শুয়ে দিনটা পার করে দেওয়ার চেষ্টা করত। আর যেসব দিন অত্যন্ত শুভ ছিল, সেসব দিনেই তারা ধর্মীয় উৎসব পালন করত।

“এপোক্যালিপ্টো”

মুভিটা দেখে ওদের সম্পর্কে আগ্রহ জাগল ।Image result for apocalypto poster
এই মুভিতে যদিও মায়াদের দন্দ সংঘাতের ব্যাপারটি তাদের বিলুপ্তির মুল কারন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে , তবে ইতিহাসের চিত্রটা বোধহয় অন্যরকম ।
স্পেনীয় উপনিবেশের সময়ের প্রথম ১০০ বছরেই নিহত হয়েছিল মায়াদের ৯০% । পরিকল্পিত ভাবে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল বসন্ত,হাম,ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো সংক্রামক ব্যাধি ।

প্রথম যখন মায়াদের সাথে স্প্যানিশ conquistador দের আনুষ্ঠানিক দেখা হয়, মায়াদের পক্ষ থেকে এসেছিল তাদের নৃপতিস্থানীয় কেউ, পালকিতে চড়ে । আর ঘোড়ায় চড়ে এসেছিল স্প্যানিশরা । তাদের দলের সামনে ক্রুশবাহী পাদ্রী । পাদ্রী পিছনে ঢাল তলোয়ার ও বন্দুক হাতে যোদ্ধার দল । 

পাদ্রী বাইবেল এগিয়ে দিল মায়াদের নেতার দিকে । নেতা বইটি গ্রহন করলেন । উল্টে পাল্টে দেখলেন । কী এই জিনিস ? এটা কোন শিল্পকর্ম না, কোন সুকৌশলী যন্ত্রও না । তিনি জিনিসটাকে একেবারেই অপ্রয়োজনীয় মনে করে ছুঁড়ে ফেলেদিলেন । সাদা রঙের এই জাতির বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে তার জানা হয়ে গেছে ।

কিন্তু স্প্যানিশদের কাছে এই আচরনের অর্থ হল ” খ্রীষ্ঠের অপমান ” । গুলির করে সবগুলো ‘জংলী’কে সেখানেই মেরে ফেলা হল ।

তবে এদের কথা আগে শুনেছিলাম ওদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পৃথিবী ধ্বংসের ভবিষৎবাণী নিয়ে যখন খবর পাড়া সরগরম তখন। 

পোস্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। পোস্টটি আপনাদের ভালো লাগলে কমেন্ট এবং শেয়ার করতে কার্পণ্য করবেন না। আপনাদের কমেন্ট এবং শেয়ার আমাদেরকে আরো বেশি লিখতে অনুপ্রেরণা যোগায়।

Similar Posts:

    None Found

Facebook Comments

খুবই সাধারণ সাধাসিধে একজন মানুষ। টেকনোলজি ভালবাসি , ভালবাসি নতুন কিছু শিখতে। আর বিশ্বাস করি শেখানটাই শেখার সবথেকে ভালো মাধ্যম।

Leave a Reply

Your email address will not be published.